জীবন দর্শন

সমবেন রায়

দে স্জ পাবলিশি [1 কলকাতা €) €) ২৩০

প্রথম দে'জ প্রকাশ : জানুয়ারি ১৯৫৮ _ প্রকাশক : সুভাষচন্দ্র দে। দে'জ পাবলিশিং ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট কলকাতা ৯৭০০ ০৭৩ শব্দগ্রস্থন : ববিশঙ্কর বণিক মাইক্রোডট্‌ কম্পিউটার ২০ শ্যামপুকুর লেন। কলকাতা ৭০০ ০০৪ মুদ্রক : স্বপনকুমার দে। দে'জ অফসেট ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট। কলকাতা ৭০০ ০৭৩

পরিচ্ছেদ

ভূমিকা

১. এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ২. মানবেন্দ্রনাথের বিপ্লবী জীবন দর্শন মানবেন্দ্রনাথের রচনা সমূহ

৩. বিপ্লবের ইতিহাস

৪. জাতীয়তাবাদের আদর্শ

৫. বস্তুবাদ বাস্তব আদর্শবাদ

৬. বিজ্ঞান, দর্শন রাজনীতি

৭. মার্কসবাদ কি ?

৮. ইসলামের এঁতিহাসিক ভূমিকা

৯. গান্ধীবাদ মানবতাবাদ পরিশিষ্ট ১. মানবেন্দ্রনাথের নতুন দর্শনের পরিকাঠামো পরিশিষ্ট ২.

মানবেন্দ্রনাথ রায় রচিত পুস্তক পুস্তিকার তালিকা

১৮

৩০

৩৯ ৬৫ ৮৭ ৯৭ ৯৯৭. ১৩৫

১৯৫১

১৫৯

১৬৬

ভূমিকা

এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান মানবেন্দ্রনাথ রায়। মানবেন্দ্রনাথের পিতা দীনবন্ধু ভষ্টাচার্য চব্বিশ পরগণার আরবেলিয়ার বিদ্যালয়ের সংস্কৃত শিক্ষক ছিলেন। আমার একটি ইংরাজি ভাষায় লিখিত বই, “দি টোয়াইস বর্ণ হেরোটিক”” বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তৎকালীন এ্যাডভোকেট জেনারেল মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত স্নেহাংশু আচার্ধ মন্তব্য করেছিলেন, “আমাদের সঙ্গে এম. এন. রায়ের অনেক মত-পার্থকা আছে, কিন্তু কথা স্বীকার করতেই হবে যে চাংডীপোতা গ্রামের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ সম্তান লেনিনের সহকর্মী হিসাবে কমিউনিস্ট আভর্জাতিকের শীর্ষ নেতৃতে পৌছেছিলেন। এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার।”

কিন্তু আরও বেশি বিস্ময়কর হলো এই দরিদ্র ভারতবাসী ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, তাসখন্দ, চিন, রাশিয়া প্রভৃতি দূর দেশে বিপ্লবের নেতৃহে আসীন হয়েছিলেন। এবং বিপ্লবের নেতৃত্বে নিজের স্থান করেছিলেন একমাত্র নিজের রাজনৈতিক জ্ঞান পারদর্শিতার জনাই। ১৯১৫ সালে গার্ডেনরীচ ডাকাতির মামলায় জামিনে ছাড়া পাবার পর মানবেন্দ্রনাথ আন্ডার গ্রাউন্ডে যান ২২ ফেব্রুয়ারী। সেইদিন বেলেঘাটায় একটি রাজনৈতিক ডাকাতি করে। তারপর প্রায় ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন দেশে বৈপ্লবিক কাজ কর্মে লিপ্ত ছিলেন ২১ জুলাই ১৯৩১ সাল পর্যস্ত যেদিন ব্রিটিশ পুলিশ তাকে বোম্বাই শহরে গ্রেপ্তার করেন। আমেরিকার নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপিকা আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনীর একটি ইতিহাসে লিখেছিলেন মানবেন্দ্রনাথকে ধরবার জন্য কলকাতার গুপ্তচর বিভাগের শীর্ষস্থানীয় অফিসার মিঃ জি. সি. ডেনহ্যাম আমেরিকায় পৌছে সেখানকার গুপ্তচর বিভাগ সংগঠন করেন। এবং এই মিঃ ডেনহ্যাম মানবেন্দ্রনাথকে ধরবার জন্য মেক্সিকো পর্যস্ত ধাওয়া করেছিলেন।

১৯২৫ সালে যখন মানবেন্দ্রনাথ জার্মান থেকে বিতাড়িত হয়ে প্যারিস শহর থেকে “দি মাসেস অফ ইন্ডিয়া” পত্রিকা করছিলেন তখন তাকে ব্রিটিশ সরকারের চাপে ২৪ ঘন্টার নোটিশে ফ্রান্স থেকে বিতাড়ন করা হয়। তার

মানবেন্্রনাথ রায় জীবন দর্শন

পরেই মানবেন্দ্রনাথ লন্ডন থেকে প্রকাশিত রজনী পাম দত্ত সম্পাদিত “লেবার মন্ডলী” পত্রিকার এপ্রিল মাসে লেখেন £

“আমার চৌদ্দ বছর বয়স থেকে প্রায় ২০ বছর আমার উপর ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার এবং অত্যাচার করেছে। ১৯১৫ সালে আমাকে ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার থেকে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে হয়।

কিন্ত দেশের বাইরেও ব্রিটিশ পুলিশ আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় নি। এক দেশ থেকে অন্য দেশে, জাভা থেকে জাপান, চীন থেকে ফিলিপাইনস, আমেরিকা, মেক্সিকো এবং ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশেই তারা আমাকে তাড়া করে বেরিয়েছে। ১৯১৭ সালে মেক্সিকোয় সেখানকার প্রেসিডেন্ট ক্যারান্ধা আমাকে আশ্রয় দেন এবং দুবার ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আমাকে তাদের হাতে তুলে দেবার অনুরোধ প্রত্যাখান করেন। মেক্সিকান সরকারের আনুগত্যে এবং পাশপোর্টের সাহায্যে আমি এবং আমার স্ত্রী ইউরোপে খানিকটা নিরাপদে পৌঁছতে পেরেছি”।

“লেবার মন্ডলী” পরবর্তী সংখ্যায় মানবেন্দ্রনাথের ফ্রা্স থেকে বিতাড়ণের প্রতিবাদে লিখেছিলেন ফরাসী কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী আঁরি বারবুসে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন আর একজনও বিপ্লবীর কথা আমি জানি না যার বিরুদ্ধে ১৯১০ সাল থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে এক ও্পনিবেশিক শাসক শক্তি পাঁচটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান আসামি হিসাবে অভিযুক্ত করে। এগুলি হলো হাওড়! ষড়যন্ত্র মামলা (১৯১০), স্যান ফ্রানসিসকার ভারত- জার্মান ষড়যন্ত্র মামলা (১৯১৭); তিন দফা পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২২- ২৪) কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪) এবং মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) ; কিন্তু এই সমস্ত সময়ের মধ্যেই তিনি সারা পৃথিবী ঘুরে মেক্সিকো, তাসখন্দ, রুশ, চিন এবং ভারতবর্ষে বিপ্লবের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে। ১৯৫০ সালে দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সীনমান রী এক ভারতীয় সাংবাদিককে (পূর্ণেন্দু রায়) তার বাসভবনে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়ে তার লাইব্রেরিতে দেখান মানবেন্দ্রনাথের সমস্ত বই এবং বলেন, ওঁর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গুপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে কার্যকলাপই তাকে রাজনৈতিক জগতে অনুপ্রেরণা দেয়। ১৯৫৪ সালের ২৬ জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীর সর্ববৃহৎ দৈনিক পুরো প্রথম গ্লাতাটি জুড়ে মানবেন্দ্রনাথের প্রতি শোক জ্ঞাপন

ভুমিকা

করা হয়েছিল, যা ভারতবর্ষের কোন পত্রিকা করেনি।

মানবেন্দ্রনাথের বৈচিত্র্যময় জীবনে তার নিজের সার্থকতা একমাত্র তার চিত্তার ব্যান্তিতে, বাস্তব ক্ষেত্রে তিনি কোন সাফল্যলাভ করেন নি, যা লেনিন, স্ট্যালিন, মাও জে দঙ বা তারই এক সময়ের ছাত্র হো চি মিন করেছিলেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট নর্থ এবং সোনিয়া অয়দিন “এম. এন. রয়েজ মিশন টু চায়না (ক্যোলিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯১৫ সালে প্রকাশিত) পুস্তকে মস্তব্য করেছেন, “এটা বলা মোটেই অত্যুক্তি হবে না যে অনগ্রসর এবং শিল্পে অনুন্নত দেশগুলির সম্পর্কে মৌলিক কমিউনিস্ট নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এম. এন. রায়ের স্থান লেনিন এবং মাও সে টুও - এর সমপরযাঁয়ের (পৃষ্ঠা ৩)। ১৯১৫ সালের পরিকল্পিত সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটেনি। ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলন তারই উদ্যোগে সংগঠিত হয়েছে কিন্তু কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটেনি, কিন্তু সেই নীতির সণিক প্রয়োগ করে হো চি মিন ভিয়েতনামে বিপ্লব সংগঠিত করতে সার্থক হয়েছেন। ১৯৩০ সালে স্বদেশে হয়েছেন। যে কমিউনিস্ট আস্তর্জাতিকে ১৯২০ থেকে ১৯২৮ পর্যস্ত শীর্ষস্থানে ছিলেন, সেই আন্তর্জাতিক থেকে ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি তার বহু ইউরোপীয় এবং আমেরিকান সহযোগীরা বহিষ্কৃত বলে গণ্য হন। তার অপরাধ ছিল হিটলারের ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট এবং সোশ্যালিস্টদের যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আহান জানানো, যে জন্য ্্ান্ডলার-থ্যালহাইমার প্রতৃতি জামনি কমিউনিস্ট সহ ১৬টি ইউরোপীয় দেশের কমিউনিষ্ট নেতাদের তিনি একত্রিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু চিস্তার ক্ষেত্রে যেটি তার একাত্ত নিজস্ব, সেখানে তিনি তার বিরাট প্রতিভা নিয়ে বিরাজ করেছেন ) কারুর কাছেই মাথা না নুইয়ে, কোন প্রলোভনেই আপোস না করে।

১৪ বছর বয়স থেকেই মানবেন্দ্রনাথ স্বাধীনতা মুক্তির আদর্শে নিজেকে নিয়োজিত করেন। সিপাহি বিদ্রোহের পলাতক আসামি শিবনারায়ণ স্বামীর কাছেই প্রথমে যোগ, তারপর সমাজ-বিপ্লব এবং গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখেন। শিবনারায়ণ স্বামী পরে বলেছিলেন নরেন ভট্টাচার্খই (মানবেন্দ্রনাথের পিতৃদত্ত নাম) তার সবথেকে উপযুক্ত শিষ্য হয়েছিল। শিবনারায়ণ স্বামীই মানবেন্দ্রনাথকে ভারতীয় সমাজে ব্রান্দাণ্য প্রাধান্যর কুফল সম্পর্কে অবহিত

১০ মানবেন্্রনাথ রায় জীবন দর্শন

করেন।

শিবনারায়ণ স্বামীর পর বিখ্যাত বৈষ্ণব সন্যাসী রামদাস বাবাজীর কাছে ধর্ম এবং দর্শন শিক্ষা, সেই সঙ্গে নিজের পিতা সংস্কৃত পন্ডিত দীনবন্ধু ভট্টাচার্যের কাছে সংস্কৃত সাহিত্য এবং দর্শন শিক্ষা ) সমস্তই তিনি দেশের স্বাধীনতা, মানুষের মুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করেন। দ্বিতীয়বার দেশ ছাড়ার আগে কপ্তিপোদায় যতীনদার বোঘা যতীন) কাছ থেকে বিদায় নেবার আগে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর ওঁরা দুজনে ব্রহ্ম" নিয়ে আলোচনা করেন, একথা আমায় বলেন প্রয়াত নলিনী কর যিনি তখন কপ্তিপোদায় উপস্থিত ছিলেন।

১৯১৬ সালে আমেরিকা পৌছবার পর যখন জামনিদের অস্ত্র পাঠানোর ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে তখন আমেরিকার স্যান ফ্র্যানসিসকো শহরে জার্মান সামরিক উপদেষ্টা ফন ব্রিনকেন -এর সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথকে কয়েকবার দেখা করতে হয়। ফন ব্রিনকেন স্যান ফ্রানসিসকোর হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হ'ন এবং দু'বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হন। পরে ১৯২০ সালে অক্টোবর প্রকাশিত তার স্মৃতিকথায় একটি কিস্তিতে “সান ফ্রানসিসকো এগজামিনার” পত্রিকায় তিনি লেখেন £ “প্রাচ্য থেকে একজন নেতা এসেছিলেন, তিনি উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন, তার আসল নামটি আমি জানতুম না, মিঃ মার্টিন বলেই তাকে জানতুম। এম. এন. রায় যখন ১৯১৫ সালে দ্বিতীয়বার ব্যাটাভিয়ায় যান, তখন মিঃ মার্টিন নামে একটি পাশপোর্ট নিয়ে যান। দীর্ঘাঙ্গী, সুপুরুষ, রাশভারি লোক, শিক্ষা সংস্কৃতিতে অত্যন্ত বিদগ্ধ বেশির ভাগ কাজই তিনি প্রধান জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে করতেন, কিন্তু অল্প বিস্তর কাজ আমার সঙ্গেও করেছিলেন। (ভারতীয়) বিপ্লবীদের মধ্যে তিনি খুব উচ্চমানের লোক ছিলেন।”

মানবেন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে ছিলেন জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী দেশের দেশের মানুষের মুক্তিই ছিল তার অনুসৃত আদর্শ। পরবর্তী জীবনে একজন মার্কসীয় আদর্শবাদী হন” শোধিত মানুষের মুক্তিই তখন তার জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য। জাতীয় মুক্তি তখন আর কয়েকজন মুষ্টিমেয় ধনিকশ্রেণীর হাতে ক্ষমতা হস্তাত্তর তার আর লক্ষ্য নয়। কীভাবে তিনি জাতীয়তাবাদী বিপ্লব থেকে মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতা, যার মূল আদর্শ শ্রমিক এবং শোষিত জনসাধারণের মুক্তি, গ্রহণ করলেন, কেন করলেন এবং কীভাবে তার চিত্তাধারার পরিবর্তন ঘটালো তার

ভুমিকা ১১

বিশ্লেষণ এবং কীভাবে তার চিত্তাধারার পরিবর্তন ঘটালো তার বিশ্লেষণ এবং অনুধাবনের প্রয়োজন আছে। কাজটি কঠিন, কারণ এই সময়ে তার কর্মজীবন সুদূর মেক্সিকো থেকে রাশিয়া এবং চিন পর্যন্ত প্রসারিত হয়।

মানবেন্দ্রনাথের মতাদর্শ এবং চিত্তাধারার বিবর্তন নিয়ে অনুশীলন করার একটি অন্তরায় হলো, তার মার্কসবাদী চরিত্র সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা মানবেন্দ্রনাথ নিজেও তার সম্পর্কে এই সব ধ্যান-ধারণা দূর করবার জন্য অনেক লিখেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন। মার্কসবাদ সম্পর্কে তার একটি নিজস্ব চিন্তাধারা ছিল। মার্কসবাদ বলতে তিনি কি বোঝেন তা নিয়ে অনেক লিখেছেন এবং তার নিজের বিচার বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।

মার্কসীয় তত্তের বিশ্লেষণের ব্যাপারে তার সঙ্গে লেনিনের মত-পার্থক্য হয়েছিল এবং বিপ্লবের পর্যায় নির্ধারণের ব্যাপারে শুধু লেনিন নয়, লেনিনের মার্কসীয় পূর্বসূরীদের মতের সঙ্গেও তার মতের অমিল দেখা যায়। মানবেন্দ্রনাথ মনে করতেন যে উপনিবেশেই আগে বিপ্লব সংগঠন করা প্রয়োজন এবং উপনিবেশে বিপ্লবের ফলেই শাষক সান্্রাজাবাদী দেশগুলিতে অর্থাৎ পশ্চিম ইউরোপীয় শিল্লোন্নত দেশগুলিতে বিপ্লব সম্ভব হবে। কারণ উর্পনিবেশগুলি থেকে শিল্পোন্নত দেশগুলি যে মুনাফা অর্জন করে, সেই মুনাফার কিছু অংশ শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে বন্টন করে সেখানকার শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লব-পরান্মুখ করতে সক্ষম হবে। প্রথম 'বিশ্বযুদ্ধের সময় দেখা গেল দ্বিতীয় (সমাজতান্ত্রিক) আত্তর্জাতিকের বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দলগুলি নিজের দেশের জাতীয় স্বার্থে ভিড়ে গেল, ফলে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙ্গে গেল। এই সময়েই, ১৯১৫ সালে লেনিন তৃতীয় (কমিউনিস্ট) আত্তর্জাতিক সংগঠন করার ডাক দেন ) জাতীয়তাবাদের আদর্শের বিরুদ্ধে

গৌঁড়া ইউরোপীয় মার্কসবাদীরা স্থির সিদ্ধান্ত করে রেখেছিলেন যে আগে শিল্পোনত দেশগুলিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তারপর এঁসব উন্নতশীল দেশের সমাজতান্ত্রিক সরকার উপনিবেশ এবং অনুন্নত দেশগুলিতে সমাজতন্ত প্রতিষ্ঠা করবে। মানবেন্দ্রনাথ ঠিক উপ্টেটাই বললেন। তিনি বললেন যতদিন না উপনিবেশিক এবং অনুন্নত দেশগুলিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ততদিন শিল্লোন্নত দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে না; এবং বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে আজও কোন শিল্লোন্নত দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়নি।

১২ মানবেন্দ্রনাথ রায় £ জীবন দশন

একমাত্র ভিয়েতনাম. চিন, কিউবা প্রভৃতি কয়েকটি অনুন্নত দেশেই তা সম্ভব হয়েছে। তৃতীয় কেমিউনিস্ট) আন্তর্জীতিকে লেনিনের সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথের যে এঁতিহাসিক বিতর্ক হয়েছিল, দুজনের এই ব্যাপারে মত-পার্থকাই ছিল্দ তার অন্যতম বিতর্কের বিষয়।

এছাড়াও অন্য অনেক বিষয়ে গোঁড়া মার্কসবাদীদের সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথের মত-পার্থক্য ছিল। বস্তুত প্রায় সকলের সঙ্গেই ওঁর কিছু কিছু মত-পার্থক্য ছিল, মতদ্বৈধতা যেন ওঁর চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এবং এই মতদ্বৈধতা একদিকে যেমন ওঁর অসাফল্যের কারণ, অন্যদিকে ওঁর জ্ঞান-পিপাসার আধারও ) যেজন্য ওঁর চিন্তাধারার বিবর্তনও বৈচিত্র্যময় এবং তা অনুশীলন করা এত চিত্তাকর্ষক।

মার্কস এবং এঙ্গেলস তাদের সমসাময়িক ঘটনাবলী পর্যালোচনা করে কতকগুলি সম্ভাব্য পরিণাম সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলি ভবিষ্যদ্বানীর মত শুনিয়েছে। অসমালোচক সরল-চিত্ত অনুগামীরা সেইসব ভবিষ্যতবাণীকে নির্ভুল বলে ধরে নেন যার ফলে তাদের প্রতিপাদ্যগুলি নিশ্চিত এঁতিহাসিক বিবর্তনের রূপ নেয়, খানিকটা পূর্ব-নির্দিষ্ট অদৃষ্টবাদের মত। মানবেন্দ্রনাথ প্রায় বলতেন এবং লিখতেন যে মার্কস মানব-সমাজের ঠিকুজি- কুষ্টি তৈরি করে যান নি। মার্কস এবং এঙ্গেলস -এর রচনা খুবই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদ্ধতি দিয়ে ইতিহাস এবং সমাজ বিবর্তনের বিচার বিশ্লেষণ সেইসব বিচার বিশ্লেষণ পথনির্দেশক, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে ) তাই সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সেগুলির পুনর্বিচারের প্রয়োজন। প্রতিবন্ধকতার কারণ তাদের প্রতিপাদাগুলিকে অবশ্যস্তাবী ভবিষ্যতবাণী বলে ধরে নেওয়ার জন্য। মার্কসীয় চিত্তাধারার বহু চিত্তাবিদকেই এইসব প্রতিবন্ধকগুলিকে সংশোধন করতে হয়েছে। লেনিন, টরটস্কী, রোজা লাক্সেমবুর্গ, এমনকি মাও জে দঙ কেও। এঁদেরই সমগোত্রীয় ছিলেন মানবেন্দ্রনাথ।

শিল্প সভ্যতার বিবর্তন বিশ্লেষণ করে মার্কস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে শিল্পের উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায় সাম্যবাদী সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। মার্কসের বিশ্লেষণে এটি শিল্প-সভ্যতার অনিবার্য পরিণতি। মানবেন্দ্রনাথ এই অবশ্যস্তাবী পরিণতির ধারণাটি সংশোধন করেন। পরবততীকালের অবস্থার প্ালোচনা করে

ভুমিকা ১৩

মানবেন্দ্রনাথ বলেন যে সাম্রাজ্যবাদী শিল্পোন্নত দেশগুলি পনিবেশে কীাচামালের পরিবর্তে যে সব ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে তার ফলে উপনিবেশ এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটছে তার মধ্যেই রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তাত্তরের অন্কুর বিরাজ করছে। মানবেন্দ্রনাথের এই চিত্তাধারায় ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট আস্তর্জাতিকে পেশ করেন “ডিকলোনাই জেশন থিওরি” যেটিকে কুশিনেন ইত্যাদি গোঁড়া মার্কসবাদীরা ধিক্কার করেছিলেন। এর দেড় বছরের মধ্যেই মানবেন্দ্রনাথ দেশে ফিরে আসেন এবং অত্যন্ত সম্তর্পণে লুকিয়ে ফিরে আসার জন্য তার বহ্ছ লেখা- পত্তরই তিনি বার্লিনের এক প্রকাশকের ঘরে সেসব রেখে আসেন। হিটলার ক্ষমতায় আসার পর এইসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলে।

সম্প্রতি ১৯১৫ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি “ডকুমেন্টস্‌ অফ দি কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া”র ভলিয়ুম ৩-সি ১৯২৮ খন্ডে প্রয়াত দিলীপ বসুর সহযোগীতায় ডঃ গঙ্গাধর অধিকারী সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এবং এই ভলিয়ুমেই কুশিনেনের সমালোচনা এবং মানবেন্দ্রনাথের প্রত্যুত্তরও প্রকাশিত হয়েছে। ১৯১৫ সালে দিলীপ বসুর বাড়িতে আমি যখন ডঃ অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি তিনি এসব কিছুর অস্তিত্ব অস্বীকার করেন এবং এও অস্বীকার করেন যে মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে বার্লিনে তার সৌহার্দ ছিল। অথচ, মুজফৃফর আহমেদ সাহেব তার “আমার জীবন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি” বইতে দুটি তথ্য পরিবেশন করে গেছেন। এক, ডঃ অধিকারী ১৯২৮ সালে কলকাতায় ওয়ার্কার্স এ্যান্ড পেজান্টস পার্টির সম্মেলনে মুজফৃফর আহমেদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করে বলেন “আমি এম. এন. রায়ের কাছ থেকে আসছি। দুই, বইতেই মুজফৃফর আহমেদ সাহেব র্লেমেন্স পাম দত্ত'র একটি চিঠি ছেপেছেন। মুজফৃফর আহমেদ জানতে চেয়েছিলেন যে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে এম.এন. রায় কেন বিতারিত হয়েছিলেন। ক্েমে্স পাম দত্ত চিঠিতে মুজফ্ফর আহমেদকে লিখছেন, গঙ্গাধর অধিকারী জানবেন, তার সঙ্গে রায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, এবং রায় তাকে সবকিছুই বলেছেন। ইতিহাসের কি বিচিত্র গতি।

পুরাতন নি্প্রাণ চিন্তাধারা বা মতবাদকে মানবেন্দ্রনাথ কোনদিনই যন্ত্রের মত আকড়ে ধরে থাকেন নি। এজন্য অনেকে তাকে অসংলগ্নতা দোষে দুষ্ট

১৪ মানবেন্দ্রনাথ রায় জীবন দর্শন

বলেছেন, কিন্তু বোঝবার চেষ্টা করেন নি। যখন তিনি বুঝলেন যে জামনি অন্ত্ সাহায্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ সম্ভব নয়, তখন তিনি সেই পথ পরিত্যাগ করতে দ্বিধা করেন নি এবং যে দেশের (মেক্সিকো) আতিথেয় তিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেই দেশের অর্থাৎ মেক্সিকোর সমস্যা সমাধানে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। ১৯৩৯ সালে যখন তিনি দেখলেন যে হিটলারের ফ্যাসি বাহিনী পৃথিবীতে প্রগতি এবং স্বাধীনতার পরিপন্থী এক বিরাট শক্তি হয়ে উঠেছে, তখন তার বিরুদ্ধে তিনি সমস্ত শক্তি নিয়োগ করলেন।

মার্কস ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান এবং সমস্যা নিয়ে কিছু লিখে জাননি; তাঁর সময়ে ফ্যাসিবাদের সম্ভাবনা বা লক্ষণ তিনি দেখতে পান নি। মানবেন্দ্রনাথ তখন বললেন যে ফ্যাসিবাদের ধ্বংসের উপরই সমস্ত পৃথিবীর মুক্তি, বাক্তি স্বাধীনতা এবং ভারতের স্বাধীনতা নির্ভর করছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করার জন্য জাতীয়তাবাদীদের কাছেও তিনি হেয় গণ্য হয়েছিলেন এবং জাতীয় কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। (এখন অবশ্য কংগ্রেস দলের নেতা ভি.এন. গ্যাডগিল বলে বেড়াচ্ছেন যে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেমন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, এখন আবার সেই রকম লড়াই করবেন ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে। যখন যে পথ বা মত তার মনে হয়েছে যে মানুষের মুক্তির বা স্বাধীনতার পরিপন্থী, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মানবেন্দ্রনাথ কোনদিন ইতস্তত করেন নি।

কেবল একটিমাত্র ক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম দেখা যায়। সেটি পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে। মৃত্যুর (১৯৫৪ সালের ২৫ জানুয়ারি) আগে পর্যস্ত তার মনে ভয় ছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নের বহির্বিপদ কাটেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পশ্চিমী শক্তিগুলি প্রথম থেকে যে চত্রাস্ত করেছিল যা তিনি দেখেছিলেন এবং ফ্যাসিস্ত জার্মানিকে যে সাহায্য এবং উৎসাহ ওঁরা প্রথম দিকে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব তার মন থেকে তিনি কোনদিন দূর করতে পারেন নি।

যে কারণে একটি রাষ্ট্রে সোশ্যালিজম বাঁচিয়ে রাখার জন্য মানবেন্দ্রনাথের আগ্রহ এতই প্রবল ছিল যে তার জন্য টুটক্কির সঙ্গে তার সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে স্তালিনের পক্ষ অবলম্বন করতে তিনি দ্বিধা করেন নি। স্তালিনের

ভুমিকা ১৫

প্রতি মানবেন্দ্রনাথের সম্প্রীতি তারপর থেকে কোনদিনই ক্ষুন্ন হয়নি। স্তালিনের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সমস্ত অত্যাচার, নিপীড়ন সন্তেও। কমিনটার্নের যে বিতর্কে একটি রাষ্ট্রে সোশ্যালিজম বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ১৯২৮ সালের সেই সভায় শেষ বক্তা হিসাবে মানবেন্দ্রনাথ ট্রট্কিকে প্রশ্ন বিপ্লব সম্ভবপর না হয় তাহলে কি আমরা একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নেই সাম্যবাদী ব্যবস্থা দৃঢ় করে রাখব না?”

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে স্তালিন যখন পূর্ব ইউরোপে সৈন্য অন্ত্রের মাধ্যমে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করেন একমাত্র তখনই মানবেন্দ্রনাথ স্তালিনের এই পদক্ষেপের প্রতি তার অসন্তোষ প্রকাশ করেন। স্ট্যালিনের কাছেই তিনি “রেড নেপোলিয়ানিজম” -এর তাৎপর্য শুনেছিলেন, কিন্তু ১৯৪৫-৪৬ সালে তিনি যখন বাস্তব ক্ষেত্রে ইউরোপে এর প্রয়োগ দেখলেন তখন প্রতিবাদ না করে থাকতে পারেন নি। “আমি যদি ত্তালিন হতুম” (1 915 5211) শীর্ষক কতকগুলি প্রবন্ধে মানবেন্দ্রনাথ তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন, তার পত্রিকা, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিয়ার পাতায়। মানবেন্দ্রনাথের মতে ইউরোপের মানবতাবাদী সংস্কৃতি এবং উন্নততর সভ্যতার ভিত্তিতেই কমিউনিজম-এর পূর্ণ এবং সুস্থ বিকাশ সম্ভব।

মানবেন্দ্রনাথ নিজে মার্কসবাদ এবং মানবতাবাদের মধ্যে কোন দ্বন্দ আছে বলে স্বীকার করতেন না। শুধু তাই নয়, তিনি মনে করতেন কার্ল মার্কস নিজেও মানবতাবাদী ছিলেন। কিন্তু মার্কসের গোঁড়া অনুগামীরা তার রচনা আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করে সেইসব রচনাকে ধর্ম সুত্রের মত গোৌঁড়াভাবে মেনে নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। যদিও তিনি মনে করেন, মার্কসের অনেক রচনা তারই অন্য রচনার বিরোধী মত প্রকাশ করেছে। তাই, মানবেন্দ্রনাথ বহুবার বলেছেন এবং লিখেছেন যে মার্কসবাদ অন্রাত্ত অপরিসীম অপরিবর্তনীয় কিছু সূত্রের সমষ্টি নয়, মার্কসবাদ ইতিহাস এবং ঘটনাবলীর বিচার এবং অনুশীলনের একটি প্রকৃষ্ট পন্থা - যেখানে ব্যক্তি বিশেষের মাহাত্ম্য বা নেতৃত্ব বড় কথা নয়। যা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় তা হলো ঘটনাবলীর এঁতিহাসিক তাৎপর্যের বৈজ্ঞানিক বিচার - সভ্যতা এবং সংস্কৃতির অগ্রগতির মাপকাঠিতে।

স্তালিন সম্পর্কে তার অবশ্য দুর্বলতা ছিল। যে জন্য ১৯৫০ সালে একটি

১৬ মানবেন্দ্রনাথ রায় £ জীবন দর্শন

সেই সঙ্গে একটি বিশেষণ যোগ করে দেন - শ্রেষ্ঠ মানুষ মানেই ভাল মানুষ নয়। এর কিছু দিন পূর্বেই তিনি যতীন মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে একটি রচনায় লেখেন, “আমি পৃথিবীর বহু মহান ব্যক্তির সানিধ্যে এসেছি, তারা মহান, ইতিহাসে স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, কিন্তু যতীনদার মত সৎ এবং ভাল মানুষ আমি আর দেখিনি

মানবেন্দ্রনাথের চারিত্রিক একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে. ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কোন মতেই রাজনৈতিক মত-পার্থক্যের কারণে ক্ষুন্ন হতে দিতেন না। একটি ছোট্ট ঘটনার কথা উত্রখ করব। প্রয়াত ভূপতি মজুমদারের সঙ্গে যখন আমি সাক্ষাৎ করি, নরেন ভট্টাচার্যের জীবন সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান, তখন তিনি আমায় এটি বলেছিলেন। ১৯০২ সালের নির্বাচনে ভূপতি মজুমদার পরাজিত হন। সকালের খবরের কাগজে খবরটি পড়ে মানবেন্দ্রনাথ ওঁকে ফোন করে বলেন, “ভূপতি অভিনন্দন নিও, আমরা আসছি” ভূপতি আমায় বলেন, “স্বভাবতই আমার মনটা খারাপ ছিল, কিন্তু নরেন সন্ত্রীক এসে হৈ হে করে সমস্ত দিন কাটিয়ে আমায় নির্বাচনের শোক ভূলিয়ে দিয়েছিল। একমাত্র নরেনের পক্ষেই এটা সম্ভব ছিল।”

বার্লিনে থাকাকালীন ব্যাঙ্ক মালিক সাইমনের বাড়িতে মানবেন্দ্রনাথ প্রায়ই আড্ডা দিতে যেতেন, সেখানে বার্নস্টাইন, কাউৎস্কি, থ্যালহাইমার, আর্নপ্ট মেয়ার প্রমুখ সকলেই আসতেন। প্রত্যেকেরই বিভিন্ন মত ছিল কিন্তু তাতে আড্ডার কোন বিঘ্ব ঘটতো না, বিভিন্ন মত জানার এবং বিনিময়ের একটা সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠতো

ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে চিন্তার ব্যাপ্তি, মানুষের মুক্তির পথ খোঁজা - এর ওপরেই মানবেন্দ্রনাথ বেশি গুরুত্ব দিতেন। একদিক দিয়ে বলা যায় তিনি রাজনৈতিক যোগী ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, “সাফল্য আমার বাসনা নয়”। “ম্মৃতিকথাস্ম তিনি লিখেছেন “সাফল্যই জীবনের মাহাজ্ম্যের মাপকাঠি হয়েছে। কিন্তু মহৎ লোকেদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর অনেকেই সাফল্যের দাম দেওয়ায় চেয়ে অসাফল্য এবং অপ্রিয়তা বণ করে নিয়েছে”। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে যখন ১৯২৮ সালে বার্লিনে চলে আসেন, অসুস্থতার কারণে, তখন স্তালিন নিজে তাকে দেশ ছাড়ার অনুমতি পত্রটি দেন, একথা আমায়

ভূমিকা ১৭

বলেছেন প্রয়াত শ্লেহাংশুকান্ত আচার্য। (এর আগে ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মানবেন্দ্রনাথ ভারতবর্ষ ফিরতে চেয়েছিলেন - বস্তুত: প্রয়াত মুজফৃফর আহমেদ আমাকে কয়েকবার বলেছেন, “আপনি খোঁজ নিন, আমরা শুনেছি উনি বোম্বাই-এ এসেছিলেন।” সেই সময় স্তালিন ওঁকে বলেছিলেন, “তুমি পৃথিবীর ভাগের ভাগ অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট নেতা (কমিনটার্নের নেতৃত্ব ছাড়া তিনি ছাপাখানা কর্মচারী ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত সুপ্রীম সোভিয়েতের সদস্য ছিলেন), কেন তুমি ভারতবর্ষে ফিরে যেতে চাইছ? ভারতবর্ষে তুমি কোনদিনই সাফল্য লাভ করতে পারবে না।” মানবেন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন, “পৃথিবীর ভাগের ভাগ মানুষ আমার দেশে বাস করে, তাদের স্বাধীনতা, তাদের মুক্তির চেষ্টা না করে আমি কি করে এখানে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি?”

মানুষের মুক্তি স্বাধীনতা যে মানুষ জীবনের ব্রত করেছিল, ব্যক্তিগত সাফল্য তার কাছে গুরুত্ব পায়নি। কোন বাধা তাকে হতাশ করতে পারেনি।

যখন ভারতবর্ষের জেলের ছোট্ট নির্জন কুঠরির মধ্যে মেনডেলজন -এর মৃত্যু যাত্রার বেহালার সুর পাশের কবর খানা থেকে ভেসে আসতো, সেই স্ঙ্গীত তাকে বিষন করতো না, তার মনকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করত। জেল থেকে স্ত্রীকে লিখতেন, “এক বছর কেটে গেল, আর পাঁচ বছর বাকি” অথবা “চার বছর কেটে গেল, আর মাত্র দু" বছর”।

এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ

এম. এন রায়ের জীবনচরিত বিষয়ক চিত্তন কেবলমাত্র ঘটনাপঞ্জির ক্রমবৃত্তাস্ত হতে পারে না, অথবা বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন দেশে তার রাজনৈতিক জীবনভূমিকার গল্পকথার সমষ্টিও হতে পারে না, অথবা তার নিজপক্ষ সমর্থনে বিভিন্ন সময়ে যে কর্মনীতি কৌশল তিনি নিয়েছিলেন তাকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে কোনো জোরালো যুক্তি খাড়া করার বিষয়ও হতে পারে না। তার মনোগত যে সব ভাবনা ছিলো যেসব বিরুদ্ধ ভাবনার সঙ্গে তার বিবাদ ছিল; এবং তাঁর যুগের আর যেসব ধ্যানধারণা ছিলো, এই সমস্তকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েই রায়ের জীবনচরিতকে বুঝতে হবে। মানবেন্দ্রনাথের জীবনের ঘটনাগুলি, অথবা বলা যায়, তার ব্যবহার, মর্যাদাোবোধ, কোনো ঘটনার বিকাশে যেভাবে ক্রিয়াত্মক হয়েছে অথবা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সেই সবই বহুল পরিমাণে তার নিজম্ব ভাবনার দ্বারা তাড়িত হয়ে বিশেষ সময়ে বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ভাবনা এবং ঘটনা পরস্পর গ্রথিত ছিলো তার জীবনে সফল মানুষ বলতে যা বোঝায় তিনি তা ছিলেন না। যদি তিনি তার ভাবনার বিপরীত কোনো কাজ করতেন তবে তাকে সুবিধাবাদী আখ্যা অনায়াসে দেওয়া যেতে পারতো। আর যদি তিনি লোক লজ্জার ভয়ে তার কোনো কোনো অভিপ্রায়কে সংশোধন করতে অস্বীকার করতেন তবে তাকে একগুয়ে এবং অবাত্তববাদী বলা যেতে পারতো।

স্পষ্ট কথায় বলতে গেলে দেশকে স্বাধীন করার তীব্র আকাঙ্া থেকেই এম. এন. রায়ের ভাবনাগুলি গড়ে উঠেছিল, যেটা তার পক্ষে ছিলো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রথমদিকে হিন্দু সংস্কৃতি সভ্যতার ওপর অতিভক্তি থেকে তিনি বিশ্বাস করতেন যে হিন্দু সংস্কৃতি পশ্চিমি সংস্কৃতি থেকে অনেক উন্নতমানের তার এই ধরনের ভাবনা বিদেশির (বা অপরিচিতের) প্রতি আদিম প্রবৃত্তিজাত ঘৃণা বা হিংসা থেকে উদ্ভূত হয়নি, অথবা একদা রাজ্যশাসনে নিযুক্ত কোন পদচ্যুত

এক আত্তজার্তিক ব্যক্তিত্ের বিকাশ ১৯

উচ্চপদস্থ আমলা পরিবারের আহত অভিমানের পরিণাম থেকেও জাত হয় নি; অথবা পুরোহিত শ্রেণীর জাত্যাভিমান, কিংবা স্বার্থে আঘাতপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী সামন্ত বা জোতদারদের মানসিক প্রতিক্রিয়ার ফল থেকেও নয়। কারণ রায় এই ধরনের কোনো গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। যদিও তাদের একটি পারিবারিক কালীমন্দির ছিল। যার আয় থেকেই সংসারযাত্রা নির্বাহ হতো, এবং যে মন্দিরের কার্যকলাপ কোনভাবেই ব্রিটিশ শাসনের ফলে ব্যাহত হয়নি।

বরং তিনি এমন একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যাঁরা অনেক কিছু আশা করতেন। ইংরেজি শিক্ষার ফলে ভারতবর্ষে অগ্রগতির অনেক পথ খুলে গিয়েছিলো যা মুসলমানদের শাসনকালে ছিলো না। প্রকৃতপক্ষে তিনি যে গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা পুববর্তী মুসলমান শাসকদের অপছন্দ করতেন ইংরেজ শাসকদের থেকেও বেশি, এবং সম্ভবত ব্রিটিশরা মুসলমান শাসকদের গদিচ্যুত করার ফলে তারা খানিকটা মুক্তির স্বাদও পেয়েছিলেন। রায় যে রাজদ্রোহী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ত্বাদের অনুপ্রাণিত করতো বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ। এটা অবশ্যই ভাববার বিষয়, আনন্দমঠ গ্রন্থখানি মুসলমানদের হাত থেকে, নাকি ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেবার জন্য লেখা হয়েছিলো।

যে সামাজিক পরিবেশের মধ্যে রায় মানুষ হয়েছেন, সেই সমাজ ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ব্যাপারে হয় উদাসীন ছিলো অথবা বিরোধী ছিলো। সিপাহি বিদ্রোহের সৈন্য এবং নেতাদের সঙ্গে বাঙালিদের বিশেষ কোন সংক্রবই ছিলো না, রায়দের দলের সঙ্গেও নয়। যে শক্তিশালী সামস্তদের প্রভাবে সিপাহি বিদ্বোহ সংঘটিত হয়েছিলো তাদের চিস্তাধারার সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিদের ধ্যানধারণা প্রচুর ব্যবধান সৃষ্টি করেছিলো বলে মনে হয়, এবং তার ফলে সাধারণভাবে বাঙালি জনমানসে সিপাহি বিদ্রোহ যথেষ্ট সাড়া জাগায়নি।

ব্রিটিশ শাসনের ফলে যেসব সুযোগসুবিধা উপস্থিত হয়েছিলো, উচ্চবর্ণের বাঙালিরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সেইসব সুযোগ সুবিধাগুলি খুব তাড়াতাড়ি ভোগ দখল করতে পেরেছিলো। বহু সংখ্যক বাঙালি সরকারি অফিসে নিন্ন মধ্যপদস্থ কর্মচারীর কাজে ঢুকে পড়েছিলো এবং কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে অতি উচ্চপদেও আসীন হয়েছিলেন তাদের নিজেদের যোগ্যতার কারণেই, বর্ণ বা উচ্চশ্রেণীর বলে নয়। রায়ের যৌবনকালে শুধু

২০ মানবেন্দ্রনাথ রায় £ জীবন দর্শন

জড়বুদ্ধি সম্পন মানুষেরাই বিশ্বাস করতো যে যোগ্যতা পুরস্কৃত হতো না; রায় যে জড়বুদ্ধি ছিলেন না তা বলাই বাহুল্য।

জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে রায়ের মানসিকতার কারণ অন্যত্র খুঁজতে হবে। একটি হচ্ছে, ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি এবং প্রায় অশিক্ষিত ইংরেজ পুঙ্গবের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ। এর ফলে বাঙালির আত্মমর্যাদাবোধ আহত হয়, এবং বাঙালিরা চাকুরিক্ষেত্রে সমান অধিকার দাবী করতে থাকে, কারণ কর্মক্ষেত্রে আয্মোন্নতির ব্যাপারে পূর্বের তুলনায় মেধা দক্ষতার প্রয়োজন ছিলো বেশি। প্রকৃত পক্ষে এই ব্যাপারকে ঘিরেই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৭০ সালে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্রণী হয়েছিলেন; আর রায় তার সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে যোগ দেন যার ফলে রায় তার স্কুল থেকে বিতাড়িত হন। যে সমস্ত কারনে মানবেন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে সক্রিয় রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন, এটা তার মধ্যে একটি প্রধান কারণ ধরা যেতে পারে।

রায়ের জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণাতে প্রথমদিকে ব্রান্মাণ্যবাদ কাজ করেছিলো। তিনি যে ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণবংশে জন্মেছেন, সে কথা তার জীবনে পরবর্তীকালেও মাঝে মাঝেই ত্বার কথাবার্তায় প্রকাশ পেতো। পরবতীকালে তার আমেরিকান বন্ধুদের একজন, অধ্যাপক রিচার্ড পার্ক, আমাকে ১৯১৫ সালে এক পত্রে জানিয়েছিলেন যে রায় সম্ভবত তার বাল্যজীবনের বাঙালি ব্রাহ্মণত্ববোধকে মনে মনে জাগিয়ে রেখেছিলেন।

ভারতের ইতিহাসে ব্রাহ্মণেরা চিরকালই নিম্নবর্ণের মানুষদের ওপর প্রভৃত্ব করে এসেছে; শুধু তাই নয়, শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে শাসকশ্রেণীর ওপরেও তারা প্রভুত্ব করেছে। চতুর্থ খিষ্টাব্দ থেকে হিন্দু শাসকরা ব্রাহ্মণদের প্রভূত্ব স্বীকার না করলেও তাদের সম্মান করতো। ব্রিটিশ শাসকরাও মোটামুটি মুসলমান শাসকদের মতই ব্রাহ্মণদের সম্মান করতো। কিন্তু অষ্টাদশ খ্রিষ্টাব্দে তারা যখন আবিষ্কার করলো যে ব্রাহ্মণদের সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ইউরোপের প্রাচীন আধুনিক ভাষার মিল আছে তখন তাদের মধ্যে ব্রাহ্মাণদের প্রতি এমন এক ্রাতুভাব জেগে উঠলো, যাকে 'আর্যন্রাতা' আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে সেমেটিক বিরোধী আবেগ থেকে ইউরোপীয়দের মধ্যে শুরু হলো আর্যামি,

এক আত্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ২১

আর্ধত্ব আর ব্রাহ্মণরা খুশি হল এই ভেবে যে, তারা শাষকশ্রেণী ইউরোপীয়দের সমকক্ষ।

ইউরোপে প্রাচ্যবিদ্যা নিয়ে আলোড়নের ফলে হিন্দু সংস্কৃতি সভ্যতা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা পায়, সেই কারণে ভারতের শাসনকার্ধে অংশীদার হবার আকাঙ্থা ভারতীয়দের মধ্যে জেগে উঠেছিলো। কোনো গণতান্ত্রিক ভাবনা থেকে ভারতের শাসনকার্ষে অংশীদার হবার আকাঙ্খা ভারতীয়দের মধ্যে জেগে ওঠেনি, বরং পুরোনো দিনের কথা ভেবে উচ্চশ্রেণীর ব্রান্মাণেরাই শাসকশ্রেণীভূক্ত হতে চেয়েছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাঙালি ব্রাহ্মণকুলের মধ্যে ক্ষাত্রবীর্যের অভাব ছিলো, এবং সেই কারণে তারা তাদের ইচ্ছা পূরণের উপায় খুঁজেছিলো অন্য পথে ) তারা শিক্ষা সংস্কৃতিতে শ্রেষ্ঠ, এই ভাবনা তাদের ছিলো বঙ্গদেশ এবং তার বাইরে অন্য প্রদেশেও ব্রাহ্মণদের অধিকারে ছিলো বহু জমি। কিন্তু সামস্তপ্রভুদের শাসন করার দিন ফুরিয়ে গিয়েছিলো। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের অসাফল্যতা প্রমাণ করেছিলো যে ইউরোপীয়দের তুলনায় অর্থশক্তি এবং ক্ষাত্রশক্তিতে হিন্দুরা পিছিয়ে ছিলো। সেইজন্য বাস্তবক্ষেত্রে ধনসম্পদে ইউরোপীয়রা এগিয়ে থাকার দরুণ হিন্দুদের একটি সুগম তত্ত খাড়া করতে হয়েছিলো নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে; সেটি হচ্ছে এই, হিন্দুরা আধ্যাত্মিক ব্যাপারে ইউরোপীয়দের থেকে শ্রেষ্ঠ

শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে হলে সামরিক অর্থনৈতিক শক্তি থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। বল প্রয়োগের দ্বারা মুসলমানেরা ব্রাহ্মণদের প্রাধান্যকে অস্বীকার করেছিলো, যেটা রাজপুতেরা পারেনি; কারণ ব্রাম্মণদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করাকে তারা পাপ মনে করতো। ব্রিটিশদেরও ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্বরকে অস্বীকার করার ব্যাপারে সর্বদাই বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা ছিল। এরূপ পরিস্থিতিতে ্রাম্মণদের পক্ষে অন্ত্রধারণ করার একটা সম্ভবনা খুবই সঙ্গত ছিলো)কিস্ত যেহেতু ব্রাহ্মণদের না ছিলো অর্থনৈতিক ভিত্তি আর না ছিলো রাজতৃ, সে কারণে তাদের পক্ষে ব্যক্তিগত ভাবে ছোট ছোট দলে অন্ত্রধারণ করাটাই ছিল একমাত্র পথ। এটাই ছিল সন্ত্রাসবাদের মূল ভিত্তি।

এম. এন. রায় একটি সন্ত্রাসবাদী দলে যোগ দিয়েছিলেন এবং এই সন্ত্রাসবাদী দলটিই সশশ্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এই অভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়

২২ মানবেন্দ্রনাথ রায় £ জীবন দর্শন

অস্ত্রশস্ত্র জার্মানি থেকে আসার কথা ছিলো। জার্মানির সঙ্গে এই স্পকটা শুধুমাত্র শত্রর শত্রু বলে যে বন্ধুত্ব হয় তাছাড়াও একটা সাংস্কৃতিক কারণ ছিলো। উনবিংশ শতাব্দীতে জামানির সঙ্গে আমাদের একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জার্মানদের সঙ্গে মানবেন্দ্রনাথের যোগাযোগ এবং কথাবার্তার মধ্যে এই সাংস্কৃতিক সম্্পক পরিষ্কার দেখা যায়।

তাছাড়া এটাও বাস্তব যে সন্ত্রাসবাদী দলের সঙ্গে কমিউনিষ্ট পার্টির সংগঠনের একটা যোগসূত্র দেখা যায়। এই যোগসুত্রটি মার্কস্বাদী সংগঠনের মধ্যে লেনিনের একটি প্রধান অবদান। দলটি হবে সেইসব ব্যক্তিদের নিয়ে যারা বুদ্ধিমান, দৃঢ়চিত্ত, শৃঙ্খল পরায়ণ এবং যারা জনসাধারণের বেশির ভাগের স্বার্থের জন্য প্রচেষ্টবান, যখন জনসাধারণ তাদের নিজেদের স্বার্থ সম্পকে অবহিত বা সচেতন নয়।

এইখানেই বৈপ্লবিক ভাবধারার শুরু। সংস্কারবাদ মনে করে হঠাৎ কিছু করা উচিত নয়। সংস্কারবাদের মতে জনসাধারণ যখন তাদের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হবে এবং সেই সচেতনতার ভিত্তিতে তাদের দাবী স্বার্থক করার জন্য সচেষ্ট হবে তখনই সমাজের পরিবর্তন সম্ভব। সন্ত্রাসবাদীরা এই কাজটি জাতির নামে করতে নিজেরাই উদ্যেগী হয়েছিলো। যে জাতি তাদের কাছে একটি সাংস্কৃতিক ভৌগলিক স্বত্বা, কিন্তু সাধারণ মানুষের ধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে নয়। মানবেন্দ্রনাথ যে সন্ত্রাসবাদ থেকে মার্কসবাদী বিপ্লবী হয়েছিলেন তার পিছনে দুটি বিশেষ ঘটনা দায়ী ছিলো। দেশ থেকে ১৯১৫ সালে অন্ত্রের সন্ধানে লুকিয়ে পালিয়ে যাবার পর তিনি ১৯১৬ সালের মাঝামাঝি আমেরিকা পৌছান, বার্লিন যাবার পথে। বার্লিনেই তার অস্ত্র সরবরাহের চুক্তিটি চূড়ান্ত করার কথা ছিলো। যেটি তিনি চিনে থাকার সময় সান ইয়াৎ সেনের মাধ্যমে ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বার্লিন যাবার আগেই আমেরিকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় এবং ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে মানবেন্দ্রনাথকে মার্কিন সরকার নিউইয়র্কে গ্রেপ্তার করে। তখন তিনি জামিন নিয়ে মেদিকোয় পালিয়ে যান।

মেক্সিকোয় যাবার পর থেকে তার ভারতবর্ষের সঙ্গে যোগাযোগও ছিন্ন হয় এবং তার দেশে ফেরার আর আপাত কোনো সম্ভাবনা থাকে না। তাছাড়া মেক্সিকোতে ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্মেরও কোনো সম্ভাবনা ছিলো না। জার্মনদের

এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ২৩

সঙ্গে যোগাযোগ পুনর্বহাল হয়েছিল কিন্তু সেই যোগাযোগের ফল তাৎক্ষণিক কোনো কাজের প্রয়োজনে আসেনি। দ্বিতীয়, মানবেন্দ্রনাথের যার প্রতি সব থেকে বেশি দায়িত্ব ছিলো, ওঁর বৈপ্লবিক দলের যিনি ছিলেন সর্বাধিনায়ক, সেই যতীন মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু তাকে সেই দায়িত্ব থেকে খানিকটা মুক্তি দিয়েছিলো। সন্ত্রাসবাদী যোগযোগের আর কোনো জরুরি প্রয়োজন ছিলো না। জরুরি প্রয়োজন না থাকায় তিনি চিত্তা করার সময় পান। বস্তুত মেক্সিকোতে সেইসময় সবাই যুদ্ধের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলো, এমনকি জার্মানরাও, তাই সবাই চিস্তায় মগ্ন ছিলো।

আমেরিকায় থাকাকালীন মানবেন্দ্রনাথ এমন কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন এবং বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যারা ছিলেন দেশাত্মক বা জাতিগত বাধ্যবাধকতার উর্দে। এদের মধো একজন হলেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ডঃ ডেভিড স্টার জর্ডন। যিনি মানবেন্দ্রনাথকে মেক্সিকোতে তার এক বিশেষ বন্ধুর নামে পরিচিতি পত্র দিয়েছিলেন, যিনি মেক্সিকোতে খুবই শক্তিশালী গন্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন। পরিচিতিপত্র দিয়েছিলেন এইজন্যে যে যদি প্রয়োজন হয় মানবেন্দ্রনাথ যেন সেখানে আশ্রয় পান। দ্বিতীয় ব্যাক্তি হলেন বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক আর্থার উফাম পোপ যিনি মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জন্য অধ্যাপকের পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েও মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন এবং মানবেন্দ্রনাথ মেক্সিকোয় যাবার পর আমেরিকায় তার সহযোগীর কাজ কর্ম চালিয়ে গেছেন। তৃতীয় হলেন এভেলীন ট্রেন্ট। ইনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের “ফাইবেটা কাঙ্সা' স্নাতিকা। যিনি তার স্বচ্ছল জীবন পরিত্যাগ করে মানবেন্দ্রনাথের সহধর্মিনী এবং সহকর্মিনী হন।

মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ম্যা্ট্রো ক্যাসেস মানবেন্দ্রনাথকে খুব পছন্দ করেন এবং মানবেন্দ্রনাথের নতুন চিন্তাধারার প্রথম যোগাযোগ তার মাধ্যমেই হয়। ক্যাসেস মানবেন্দ্রনাথকে বলেন যে ভারতবর্ষের পক্ষে মিস্ট্রিসিজম পরিত্যাগ করে ফরাসি দার্শনিক 'ভলতেয়ার থেকে জ্ঞান আহরন করলে ভালো ছাড়া খারাপ হবেনা। তখন থেকেই শুরু হয় পাশ্চাত্য সংস্কৃতি দর্শন সম্বন্ধে মানবেন্দ্রনাথের চর্চা, ভলতেয়ার এবং সেরভান্তেজ পড়ার উদ্যেগ। মানবেন্দ্রনাথের কথায় “সেরভান্তেজ এবং ভলতেয়ার তার কাছে শুধুমাত্র দুটি

২৪ মানবেন্দ্রনাথ রায় জীবন দর্শন

নাম ছিলো। তাদের কোনো লেখা তিনি আগে পড়েন নি। বস্তুত সেরভান্তেজ এর নামও তিনি শোনেননি ।”

নিউ ইয়র্কে থাকতেই আমেরিকান র্যাডিক্যালদের প্ররোচনায় তিনি মার্কসবাদ সম্পর্কে পড়াশুনা শুরু করেন, নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাই ব্রেরীতে। বোধ হয় ওর স্ত্রী এভেলীন এই পড়াশোনার ব্যাপারে সাহায্য করেন। কিন্তু মার্কস্বাদ অপেক্ষা যেটি তাকে আরও গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হলো ইউরোপীয় সংস্কৃতির ব্যাপ্তি বিকাশ।

মেক্সিকোতে যেটি তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে সেটি হলো সাধারণ ইউরোপীয়নদের ন্যুনতম শিক্ষার মান। জার্মান ব্যবসায়ীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সামর্থ। একজন ব্যবসায়ীর স্ত্রী ওকে শিল্প এবং শিল্পীর জগৎ সম্পর্কে অবহিত করেন। সেই সময় প্যাবলো ক্যাজাল, মেক্সিকান সঙ্গীত শিল্পী এবং তীর স্ত্রী এবং একজন পোল্যান্ড অধিবাসী পিয়ানো বাদক তাকে পাশ্চাত্যে সঙ্গীত সম্বন্ধে শিক্ষা দেন। মানবেন্দ্রনাথ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন এইভাবে তিনি ক্রমশ ইউরোপের মধ্যবিত্ত সমাজের নানান এবং বিবিধ চিন্তাধারা এবং জ্ঞানের জগৎ সম্পর্কে অবহিত হন। অর্থোপাজন বা অস্ত্রশস্ত্রের দিকটা কোন প্রাধান্য পায় নি। তার মন থেকে সন্ত্রাসবাদী চিন্তা ক্রমশ দূর হতে থাকে আর কমতে থাকে নিজের ব্রাক্ষণ্য সংস্কৃতির গরিমা।

যদিও তিনি একথা স্বীকার করেননি, তবুও আমার মনে হয় নিউইয়র্কে গ্রীনউইচ ভিলেজ" এর প্রভাব ) যে প্রভাব মেক্সিকোতেও তার ওপর বিশেষভাবে দৃষ্ট হয়। গ্রীনউইচ ভিলেজের শিল্পী, লেখক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের মেক্সিকো শহরে অবস্থিতির মাধ্যমে তার মনে সেই সবের প্রভাব প্রাধান্য অনেক পেয়েছিলো। মেক্সিকোয় তিনি এক নতুন কর্মময় সাংস্কৃতিক জগতে বাস করেছিলেন যেটি ছিলো ইউরোপীয় সাংস্কৃতির একটি বিশেষ অঙ্গ। আমেরিকা থেকে যারা মেক্সিকোয় পালিয়ে এসেছিলো - যাদের নাম দেওয়া হয়েছিল ভবঘুরের দল - তাদের সঙ্গে তিনি এক নতুনত্ব বিজ্ঞান সম্মত সাংস্কৃতিক কর্মজীবনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কলকাতার বই-পড়া মানুষের মধ্যে ধর্মীয় আচার ব্যবহারে এটির অভাব ছিলো।

মেক্সিকোর এই জীবন এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব পরবতী পনের বছর

এক আত্তজার্তিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ২৫

তাকে অভিভূত করেছিলো ) তার সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যেও। সাংস্কৃতিক জগতের এই বিস্তার এবং গভীরতা তাকে অভিভূত করেছিলো, ) পরবতীঁকালে ভারতবর্ষের জেল থেকে তিনি যে সব চিঠিপত্র তার বাগদত্তা এলেন গটস্চাককে লেখেন তাতে এটি বিশেষভাবে দেখা যায়। জাতীয়তাবাদ এতে কোনো সাংস্কৃতিক প্রাচীর সৃষ্টি করেনি। অনেক স্প্যানিশ মানুষ যেমন ফরাসি সংস্কৃতিকে নিজের সাংস্কৃতিক এতিহ্য বলে গণ্য করেছিলো তেমনই আবার সংস্কৃতির জগতে জার্মান, মেক্কান, স্প্যানিয়ার্ডস, আমেরিকান, ইংরাজ, ফরাসি, রাশিয়ান সকলেই অন্যদের সঙ্গে অনায়াসেই সাংস্কৃতিক ভাবনাচিত্তা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারতেন। ইতিহাস এবং সেই ইতিহাসের সংস্কৃতি সকলের কাছেই পরিচিত ছিলো, বোধগম্য ছিলো। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির একগুঁয়েমি, অন্য সমাজ সংস্কৃতিকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং নিজের চিস্তাধারা সামাজিক নিয়মের বাধাবাধকতা এই পরিবেশে অনুপস্থিত ছিলো। একটি বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং ভ্রাতৃত্ববোধ প্রাধান্য লাভ করেছিলো। রুশ বিপ্লবের প্রথম যুগের এটাই বোধহয় সব থেকে গুরুতৃপূর্ণ অবদান ছিলো। ১৯২০ এর এবং ৩০ এর দশকে রুশ বিপ্লব এই যে বিশ্বজনীন আর্তঁজাতিকতা পৃথিবীর বিশেষ করে পশ্চিমী জগতের বুদ্ধিজীবিদের প্রভাবিত করেছিলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ ক্ষুন্ন হতে থাকে এবং তার পরিবর্তে প্রাধান্য লাভ করে জাতীয়তাবোধ।

মেক্সিকো থাকার সময়েই মানবেন্দ্রনাথ তার জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির উর্ধে উঠেছিলেন এবং যেহেতু জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল সাংস্কৃতিক তাই তিনি জাতীয়তাবাদের উর্ধে উঠতে পেরেছিলেন। এই ব্যাপারে মার্কস্বাদ হয়তো তার মনে একটি নূতন আদর্শের ভিত্তি তৈরি করেছিলো কিন্তু ইউরোপীয় সংস্কৃতির ব্যাপ্তির কাছে মার্কস্বাদকেও ছোট বলে মনে হয়। যদিও মার্কস্বাদ ইউরোপীয় ইতিহাস সভ্যতা বোঝার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিলো বলে তিনি মনে করতেন তবুও আমার ধারণা যে ইউরোপীয় সংস্কৃতি তাকে মার্কস্বাদেরও উর্ছে নিয়ে গিয়েছিলো।

মেক্সিকোতে বরোদিনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং ব্যাপক আলোচনা তাকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইউরোপীয় সংস্কৃতি বুঝতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু তবুও পরবর্তীকালে যখন বার্লিনে অগাষ্ট থ্যালহাইমার এর সঙ্গে তার পরিচয়

২৬ মানবেন্দরনাথ রায় 2 জীবন দন

হয় তখন থেকে থ্যালহাইমারের প্রভাবে তিনি রেনেশশাসের পূর্ববর্তীকালের শিক্ষা সংস্কৃতির উপরেই আরো বেশি গুরুত্ব দেন। যে শিক্ষা সংস্কৃতির মধ্যে মানবিকতার প্রভাব অনেক বেশি ছিলো।

ইতিহাসের যে ধারায় মানবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন সেটি হলো প্রধানত ইউরোপায়, গ্রিস এবং রোমে এর শুরু। মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাবে খানিকটা অবনমন এবং তারপর রেনেশীসের প্রভাবে সেই থেকেই এর বিরামহীন প্রসার ব্যাক্তিগতভাবে তিনি ইউরোপীয় সংস্কৃতিকেই গ্রহণ করেছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গদেশে (কলকাতায়) এর একটি গ্রহণীয় ভিত্তি তৈরি করেছিলেন ডিরোজিও এবং মেকলে। যদিও তার বেশিরভাগ স্বদেশবাসীরাই এই ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রতি উৎসাহিত হয়নি। মেক্সিকোয় মানবেন্দ্রনাথ যখন দেখলেন যে মেক্সিকোর বুদ্ধিজীবিদের প্রায় সকলেই ফরাসি ভাষা এবং সংস্কৃতিকে নিজেদের বলে ধরে নিয়েছেন তখন তার পক্ষে ব্যাপারটি আরো সহজ হয়ে দীড়ায়। বাঙালি বৃদ্ধিজীবিরাও ইংরেজিকে এভাবে গ্রহণ করেছিলো কিন্তু খুব একটা প্রসন্নচিত্তে বা উৎসাহের সঙ্গে নয়।

মেক্সিকো থেকে মানবেন্দ্রনাথ যখন ইউরোপে যান তার মন ইউরোপীয় সংস্কৃতি এবং সভ্যতাকে জেনে নেবার জন্য বেশ খানিকটা তৈরি হয়েছিলো। যখন তিনি আমেরিকায় পৌঁছান তখনও তিনি মননশীলতার দিক থেকে অন্য এক আধ্যাত্মিক জগতে বাস করতেন যে জন্য তিনি আমেরিকায় বিশেষ লাভজনক কিছু করতে পারেন নি। কিন্তু তিনি আড়াই বছর মেক্সিকোয় থাকার পর যখন ইউরোপে যান তখন তিনি জার্মানির এবং ইউরোপের কর্মযজ্ঞ থেকে লাভ করবার জন্য উন্মুখ হয়েছিলেন। তিনি জানতেন জার্মানিই তখন দর্শন, বিজ্ঞান, কাব্য এবং সঙ্গীতের পীঠস্থান, প্রাসিয়ান যুদ্ধাকাঙ্থা সত্বেও। তিনি হতাশ হননি। আধুনিক সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা জার্মানিতেই সার্থকতা লাভ করেছিলো; তাই সেখানে তিনি এডউয়ার্ড বার্নস্টাইন, কার্ডটক্কি, হিলফারডিং, এডউয়ার্ড ফুকস, অগাষ্ট থ্যালহাইমার এবং আন্মষ্ট মেয়ার প্রভৃতির সঙ্গ লাভ করে শুধু খুশিই হননি, তাদের মানবিকতায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং সহনশীলতায় অভিভূত হয়েছিলেন।

মার্কস্বাদের প্রতি মানবেন্দ্রনাথ আকৃষ্ট হয়েছিলেন রাজনৈতিক অথবা

এক আত্তজার্তিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ২৭

অর্থনৈতিক কারণে নয়। বস্তুত মার্কস্বাদের প্রতি তার আকর্ষনের প্রধান কারণ ছিলো মার্কসবাদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানবেন্দ্রনাথ তীর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে মেক্সিকোতে তারা একটি ছোট বিশ্বজনীন গোষ্ঠী গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন যাঁরা ছিলেন মুক্তি এবং স্বাধীনতার উপাসক। তাই মানবেন্দ্রনাথ যেমন উগ্র প্রোলেতেরিয়ানতা গ্রহণ করতে পারেন নি, তেমনি আবার বুর্জোয়া আচার-ব্যবহারও মেনে নিতে পারেন নি। পরবতঁকালে তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন “যে একমাত্র স্বাধীন চিস্তানায়কদের নেতৃত্বেই নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, কারণ এরাই মানবিক এঁতিহ্যের ধারক” মানবেন্দ্রনাথ আরো মনে করতেন যে অষ্টাদশ শতাব্দীতেই চিস্তানায়কদের এই আধিপত্য বিশেষভাবে দেখা যায় এবং শতাব্দীতেই ইউরোপীয় সংস্কৃতি শীর্ষস্থানে পৌছেছিল। এই বিষয়ে তিনি ইতালীর মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবি আযান্টোনিও গ্রাম্শৃচির সঙ্গে একমত পোষণ করতেন যে মার্কস্বাদের দার্শনিক ভিত্তিগুলি নতুন করে ভেবে দেখবার প্রয়োজন হয়েছে এইজন্য যে তাহলে মার্কস্বাদ আদর্শবাদীদের মানসিক প্রয়োজন মেটাতে পারবে। তবে গ্রাম্শৃচি সম্পর্কে তার এই ধ্যানধারণা পরবর্তীকালে হয়েছিল।

ইউরোপ থেকে যখন তিনি তাসখন্দ যান সেখানেও মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছিল। সেইজন্য বিশ্বজনীন সংস্কৃতিতে যেটি ছিল প্রধানত ইউরোপীয়, তার সঙ্গে ইসলামিক সংস্কৃতি সভ্যতার সম্পর্ক নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। মুসলমানরা গ্রিক সভ্যতার এবং সংস্কৃতির অনেকখানি মধ্যযুগে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং পরবতীকালে এই গ্রিক ধ্যানধারণা মুসলমান সমাজ মারফত ইউরোপে প্রবেশ করে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপের জাগৃতির ভিত্তি স্থাপন করে। যদিও ব্যাপারটা এরকম সহজভাবে হয়নি। তবুও গ্রিক সভ্যতা মুসলমান জগংই ইউরোপে নিয়ে গিয়েছিল এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মুসলিম সমাজের একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল। মানবেন্দ্রনাথের এই গবেষণা পরবতীকালে তিনি একটি বই লিখে প্রকাশ করেছেন। বইটির নাম 'ইসলামের এঁতিহাসিক অবদান"

কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ইউরোপের কোন যোগ ছিল কিনা কিংবা কি যোগ ছিল এটি তিনি করে যেতে পারেন নি। মেক্সিকোতে মা্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি তে

২৮ মানবেন্্রনাথ রায় জীবন দর্শন

ভারতীয় ইতিহাসের একটি বিচার তিনি করেন। ভারতবর্ষ সম্পকে সেই বইটি স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। 'ভারতবর্ষের অতীত, বর্তমান ভবিষাত, এই নামে ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু বইটি ভারতীয়দের আর্ধতব অগ্রাহ্য করা ছাড়া আর বেশি দূর এগোয়নি। বইতে তিনি দেখিয়েছিলেন যে ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত প্রাকআর্য এবং প্রাচীন ভারতের সমাজ সংস্কৃতি তৎকালীন অন্যান্য সভ্যতার থেকে খুব বেশি পৃথক ছিল না। ইউরোপ এবং ভারতবর্ষের সভ্যতার বিকাশ সমান্তরাল ছিল, এইরকম একটা চিস্তাধারা মানবেন্দ্রনাথের মনকে বহুদিন আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু সম্পর্কে তাঁর কার্যকলাপ এবং গবেষণা পরবতকালে তার ভারতবর্ষে ফেরার পর ঘটেছিল। প্রাটীন ভারতে যে একটি মানবতাবাদী এবং খানিকটা বিজ্ঞানসম্মত চিস্তাধারা ছিল - প্রায় গ্রিসের সমসাময়িক এবং তুলনীয় ) যেগুলি পরবতীকালে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার ফলে চাপা পড়ে যায় এটিই তিনি প্রাথমিকভাবে একটি বইতে লিখেছেন। বইটির নাম 'বস্তৃবাদ', যেটি তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন এই বলে যে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারার এটি একটি প্রাথমিক পরিকাঠামো।

ইউরোপীয় সভ্যতা সম্পর্কে মানবেন্দ্রনাথের ধ্যানধারণা জওহরলাল নেহেরুর থেকে আলাদা ছিল। জওহরলাল নেহেরু ছিলেন আর একজন প্রাক স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় নেতা যাঁর মধ্যে আর্তজাতিক চিত্তাধারা বিশেষভাবে দেখা যেত। নেহেরুও বিশ্বাস করতেন সমস্ত পৃথিবীতেই ইতিহাস এগিয়ে গেছে। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে তিনি মনে করতেন যে ভারতবর্ষের অনগ্রসরতার একমাত্র কারণ ছিল বৈদেশিক শক্তির কাছে পরাধীনতা, কিন্তু বৈদেশিক শক্তির কাছে পরাধীনতা যে অনগ্রসরতার জন্যই হয়েছিল সেটা তিনি মনে করতেন না। শিল্প, ব্যবসা, বাণিজ্যের দিক দিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম যুগে ভারতবর্ষ আর ইউরোপ প্রায় সমপর্যায়েই ছিল। কিন্তু সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক পার্থক্য ছিল। নেহেরু মনে করতেন ভারতবর্ষ আর ইউরোপের এই যে পার্থক্য এটির কারণ ছিল ইউরোপের শিল্পবিপ্লব প্রসার। ভারতবর্ষকে যদি শিল্পোননত করা যায় ভারতবর্ষও ইউরোপের সমপর্যায়ভূক্ত হবে। নেহেরু এটা ভাবেননি যে শিল্পবিপ্লব শুধুমাত্র ওয়াট নামক একজন বিজ্ঞানীর কেটলিতে জল ফোটার থেকে ইঞ্জিন আবিষ্কার করা নয়। এর পেছনে ছিল বহুদিনের জ্ঞানবিজ্ঞানের পরিকাঠামো রেনেশাসের পর থেকে। যে জ্ঞানবিজ্ঞানের

এক আত্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ২৯

ইতিহাস ইউরোপের রেনেশ্শাসের ইতিহাসের সঙ্গে সমাত্তরাল। তাই মানবেন্দ্রনাথ শিল্প বিপ্রব অপেক্ষা রেনেশীস এবং মননশীলতার জাগৃতির ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই জন্যেই তিনি অর্থনৈতিক কার্যকারণতা যে সীমিত তা মনে করতেন।

আর কোন ভারতীয় ইউরোপীয় সভ্যতার সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার এইভাবে বিচার করবার চেষ্টা করে নি। মানবেন্দ্রনাথ মনে করতেন যে ইউরোপীয় সভ্যতা মানবিকতার একটি প্রকৃষ্ট পর্যায় যেখানে ইউরোপীয় সভ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্ত জগতের সভাতার কেন্দ্রস্থানীয় যে কেন্দ্রে প্রাগেতিহাসিক যুগ থেকে সমস্ত সংস্কৃতির ধারা মিশে গিয়ে একটি বিশ্বব্যাপি সভ্যতা পরিপূর্ণ এবং সার্থক করেছে।

মানবেন্দ্রনাথের বিপ্লবী জীবন দর্শন

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উপর একটি প্রবন্ধে মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৩৯ সালের ৩০শে জুলাই তারিখের “ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিয়া” সাপ্তাহিক পত্রিকায় লিখেছেনঃ “দেশ ছাড়ার আগে চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছিল ।......... অরবিন্দ ঘোষের মামলায় অপূর্ব সওয়াল বাগ্মীতা তাকে রাজনীতিতে টেনে আনে .... তখনকার রাজনীতি ছিল সত্যই বৈপ্লবিক” এই বৈপ্লবিক রাজনীতির একজন নেতা হিসাবেই মানবেন্দ্রনাথ, তখন নরেন ভট্টাচার্য, ব্যাটাভিয়া যান জার্মানদের সঙ্গে অস্ত্র আনার জন্য বন্দোবস্ত করতে। প্রথমবার যান ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে এবং দ্বিতীয়বার ১৯১? সালের আগস্ট মাসে - চার্লস্‌ মার্টিন ছদ্মনামে এই দ্বিতীয়বার দেশ ছাড়ার পর চিন, জাপান, ফিলিপিনস্‌ ইত্যাদি সব দেশ ঘুরে নরেন ভট্টাচার্য আমেরিকায় পৌঁছান. ১৯১৬ সালের জুন মাসে।

ওই প্রবন্ধে মানবেন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, “গয়া কংগ্রেসের প্রান্কালে আমার এক দূত তার চিত্তরঞ্জন দাশ) সঙ্গে দেখা করেন আমার একটি চিঠি নিয়ে। চিঠিতে আমি যা লিখেছিলুম সে সম্পর্কে তিনি খুবই সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং ওই পত্রবাহ্ক মারফৎ উনি আমায় যা জানিয়েছিলেন তা আমাকে এখনও গোপন রাখতে হচ্ছে।” ওই দূত ছিলেন ১৯২৪ সালের কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী নলিনী গুপ্ত। ১৯৫০ সালে নলিনী গুপ্ত সে সম্পর্কে আমাকে কিছু বলেন। এক, গয়া কংগ্রেসের জন্য মানবেন্দ্রনাথ যে প্রস্তাব কার্যসূচী চিত্তরঞ্জন দাশকে মস্কো থেকে পাঠান - উনি সেই প্রস্তাবের প্রতি তার সমর্থন জানান কিন্তু ব্রিটিশ শাসনে দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বিচার করে তিনি সেই প্রস্তাবের মূল বক্তব্যটি নিজের ভাষায় গয়া কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে উল্লেখ করেন। সেটি হলো £ “আমি যে স্বাধীনতা চাই তা সাদা চামড়ার পরিবর্তে কালো চামড়ার শাসন নয়, আমি দেশের শতকরা ৯৮

মানবেন্দ্রনাথের বিট্লবী জীবন দর্শন ৩১

জনের জন্য স্বাধীনতা চাই।” স্মরণ করা যেতে পারে যে মানবেন্দ্রনাথ প্রেরিত ওই প্রস্তাবটি ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত সংবাদপত্রে কংগ্রেস অধিবেশনের ঠিক দুদিন আগে প্রকাশ করা হয়েছিল - কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে কমিউনিস্ট অনুপ্রবেশের আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য।

চিত্তরঞ্জন দাশ, নলিনী গুপ্তকে আরও বলেন “নরেন পোস্ট অফিস চায়”, অর্থাৎ মানবেন্দ্রনাথ তখন 'ভ্যানফ্যার্ড ইত্যাদি পত্রপত্রিকা বই পাঠাবার জন্য দেশের মধ্যে কিছু ঠিকানা চেয়েছিলেন, যে সব ঠিকানায় তিনি ওই পত্রিকা পাঠাতে পারবেন দেশের মধ্যে প্রচারের জন্য ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের রিপোর্ট থেকে পাওয়া যায় যে ৩/৪ হাজার কপি পত্র-পত্রিকা মানবেন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের মধ্যে পাঠাতেন। চিত্তরঞ্জন দাশ নলিনী গুপ্তকে সারা দেশে বহু গণ্যমান্য লোকের ঠিকানা দেন এবং তাদের তিনি জানিয়েও দেন যে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি জায়গা থেকে তাদের নামে মানবেন্দ্রনাথ পত্র পত্রিকা পাঠাবেন। এবং সেগুলি যেন তারা গ্রহণ করেন এবং বিতরণ করেন।

বৈপ্লবিক জীবনের বহু কথাই মানবেন্দ্রনাথ বলে যাননি তার “স্মৃতি কথা'- তেও তিনি এসব লেখেননি। তার প্রথম স্ত্রী এভেলিনের কথাও যেমন তিনি লেখেননি, তেমনি তার একজন প্রধান সহযোগী অধ্যাপক আর্থার পোপ-এরও তিনি নামোল্লেখ করেননি। এভেলিনের সঙ্গে তিনি স্ট্যানফোর্ডে পরিচিত হন; অধ্যাপক পোপের সঙ্গেও তিনি স্ট্যানফোর্ডেই পরিচিত হন। দু'জনের সঙ্গেই ওর পরিচয় হয় ধনগোপাল মুখোপাধ্যায় তার আমেরিকান স্ত্রীর মারফৎ। ১৯৮১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে শহরে সম্পর্কে আমি অনেক নথিপত্র এবং দলিল পাই। এর মধ্যে একটি দলিল হলো স্যান ফ্র্যান্সিসকোয় অবস্থিত উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের গ্যারি প্রেস্টন সাহেবের একটি গোপন নোট, অধ্যাপক পোপ সম্পর্কে - ওয়াশিংটনে এ্যাটর্নি জেনারেলকে লেখা, ১৯১৮ সালের ২রা এপ্রিল তারিখে।

মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার কয়েকমাস পর বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকরিটি পোপ পদত্যাগ করতে বাধা হ'ন। তখন তিনি আমহার্্স কলেজে একটি অধ্যাপনার কাজ পান কিন্তু সেটিও ওই একই কারণে তাকে ছাড়তে হয়। তারপর তিনি আমেরিকার যুদ্ধ বিভাগে একটি চাকরি নেন। ওই নোটটিতে প্রেস্টন সাহেব ঘ্যাটর্নি জেনারেলকে

৩২ মানবেন্দ্রনাথ রায় £ জীবন দর্শন

লিখছেন কি কারণে পোপকে ওই চাকরিতে রাখা যেতে পারে না।

“অধ্যাপক আর্থার উপহাম পোপ লালা হরদয়ালের সঙ্গে ১৯১১ সালে পরিচিত হ'ন এবং তখন থেকেই হিন্দু বিপ্লবীদের সহযোগী হ'ন।.....কিস্তু সব থেকে ন্যাকারজনক হলো হিন্দু বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ। এই নরেন্দ্র হলেন ভারতবর্ষের সব থেকে হিংসাত্মক বিপ্লবী।